বার্ট্রান্ড রাসেল
সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাব
অনুবাদ
সুহৃদ
সরকার
A Bangla Translation of Impact of Science on Society by Bertrand Russelll
SmashWords Edition
January 2012
This book is written in Bangla (Bengali) language and uses Unicode fonts (UTF-8). You need to have Bangla OTF fonts, such as SolaimanLipi, Likhan, Nikosh, installed on your device. If you face difficulties in reading this book, please report to suhreedsarkar@gmail.com. For more information, visit http://www.suhreedsarkar.com.
এই বইটি কেবল আপনার জন্য লাইসেন্সকৃত। আপনি যদি এটি না কিনে থাকেন তাহলে এক্ষুনি www.smashwords.com এ ফেরত দিন এবং একটি কপি কিনুন। আপনি একটি কপি কেনার পর সেটি কেবল নিজের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। অন্য কাউকে সেটি দিতে পারবেন না। অন্য কাউকে দিতে চাইলে তার জন্য আরেকটি কপি কিনুন। এই নীতি মেনে চলার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
অক্সফোর্ডের রাস্কিন কলেজে প্রদত্ত বক্তৃতার সমন্বয়ে এই পুস্তক গড়ে উঠেছে, এর মধ্যে তিনটি প্রবন্ধ পরবর্তীতে নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এ পঠিত হয়েছে। এই পুস্তকের শেষ অধ্যায়টি ১৯৪৯ সালের ২৯ নভেম্বর লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি অব মেডিসিন-এ রবার্ট লয়েডস স্মারক বক্তৃতা হিসেবে পঠিত।
বার্ট্রান্ড রাসেল সেই বিরলতম প্রতিভা যিনি একাধারে দার্শনিক, গনিতবিদ এবং শান্তির পক্ষে আন্দোলনকারী। তাঁর বেশিরভাগ লেখাই দর্শনের উপর, কিন্তু নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন সাহিত্যে। এ থেকেই বোঝা যায় তাঁর দর্শন আসলে কাঠখোট্টা দর্শন নয়। তাঁর দর্শনের রচনা যেমনি বিচিত্র তেমনি সুখপাঠ্য ও সহজবোধ্য। তিনি শুধু দার্শনিক কিংবা গণিতবিদই নন, একই সাথে রাজনীতিক ও যুদ্ধবিরোধী প্রচারক। যুদ্ধের বিভীষিকা তাঁর কাছে মনে হয়েছে মানবসভ্যতার প্রতি সবচেয়ে হুমকিস্বরূপ। যুদ্ধের প্রতি তাঁর এই বিরাগ এবং যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে তাঁর উদ্বিগ্নতা The Impact of Science on Society গ্রন্থেও ফুটে উঠেছে। এ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিজ্ঞান আজ কিছু গোঁড়া (বাম ও ডান উভয়ই) অবিবেচকের হাতে পড়ে মানুষের কল্যাণ সাধনের পরিবর্তে মানবজাতিকে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায়ও তিনি বাতলে দিয়েছেন। বলেছেন, মানবজাতি বিজ্ঞানের এই অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে তাকে অবশ্যই একটি বিশ্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে যার হাতে থাকবে সমস্ত অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ; জনসংখ্যার বৃদ্ধি হ্রাস করতে হবে; সম্পদের সমবণ্টন নিশ্চিত করতে হবে; এবং ব্যক্তির উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর স্বভাবমতোই মানুষকে যুক্তিবাদী হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিজ্ঞান আজ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাব দেখাতে গিয়ে তিনি প্রথমে আলোচনা করেছেন বিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে। আজকাল আমরা বিজ্ঞান বলতে সাধারণত বিজ্ঞানের কৌশলকেই বুঝি, রাসেল এর বিপদ সম্পর্কে অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন।
বিজ্ঞান একটি দর্শন, যার মূল হলো প্রমাণের উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসা, কোনো কর্তৃত্বের কথায় নয়। বিজ্ঞানের দর্শনে গোঁড়ামির কোনো স্থান নেই, সেখানে সবই আপাতসত্য - আজ এখন যা সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে তা আগামীতে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হতে পারে, তবে সেটি হতে হবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে লব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে। কোনো ধর্মীয় আদেশ কিংবা আবেগের বশে বিজ্ঞানের কোনো সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে না। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন গোঁড়ামি কীভাবে বিজ্ঞানের বিকাশকে রোধ করে, এবং কীভাবে বিজ্ঞানকে মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে।
এ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বার্ট্রান্ড রাসেল ঐতিহ্যগত বিভিন্ন সংস্কার এবং সেগুলির উপর বিজ্ঞানের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিজ্ঞানের আবির্ভাবে অনেক পুরনো কুসংস্কার দূর হয়েছে এবং মানুষের উপর নির্যাতনের প্রকোপ কমেছে। ঐতিহ্যের সাথে বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব এবং সেটি অতিক্রমের ইতিহাসও বিধৃত হয়েছে এখানে।
এরপর আলোচনা করা হয়েছে সমাজে বিজ্ঞানের সাধারন প্রভাব সম্পর্কে। এরকম প্রভাবের মধ্যে রয়েছে যান্ত্রিক শিল্পের বিকাশ এবং তার পরিণতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে সমাজের নূতন বিন্যাস, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কৌশলের উদ্ভবের সাথে নূতন অনুসর্গের সৃষ্টি, ইত্যাদি। বিজ্ঞানের নব আবিষ্কৃত কৌশলসমূহ কীভাবে গোঁড়ামির সাথে ব্যবহৃত হয়েছে তাও এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
রাসেল দেখিয়েছেন যে, গোষ্ঠীতন্ত্রে বিজ্ঞান নিরাপদ নয়, এবং সেখানে বিজ্ঞানের বিকাশও সম্ভব নয়। বিজ্ঞান সেখানে কেবল কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, মানুষের জন্য কল্যাণকর দর্শন হিসেবে নয়। গোষ্ঠীতন্ত্রে বিজ্ঞান কেবল কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই ব্যবহৃত হতে পারে। সেই গোষ্ঠীতন্ত্রীরা আধুনিক হলে বিজ্ঞানের ভয় আরো বেশি। রাসেল ইতিহাসের বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন গোষ্ঠীতন্ত্রীরা বিজ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করেছেন, এবং তাঁর সময়কার গোষ্ঠীতন্ত্রীরা, বিশেষ করে সমাজতন্ত্রীরা, বিজ্ঞানকে কীভাবে ব্যবহার করছেন। তাঁর মতে, গোষ্ঠীতন্ত্রে বাড়তে থাকে বৈজ্ঞানিক সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্যই গণতন্ত্র প্রয়োজন। তবে গণতন্ত্রই যথেষ্ট নয়, সেই সাথে ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে যা মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি দেবে। গোষ্ঠীতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের উত্তরণের মাধ্যমে নূতন চিন্তাকে উৎসাহ না জোগালে বিজ্ঞানের অগ্রগতিও সম্ভব হবে না।
শুধু যে গোষ্ঠীতন্ত্রেই বিজ্ঞান নিরাপদ নয়, তা নয়। গণতন্ত্রের মধ্যেও বিজ্ঞানের নিরাপদ ব্যবহার সুদূর পরাহত থেকে যেতে পারে, বিশেষ করে তা যদি যথাযথ গণতান্ত্রিকভাবে ব্যবহৃত না হয়। রাসেল দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র কীভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বৈজ্ঞানিক সমাজের চরিত্রের কারণেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যথেষ্ট মাত্রায় ব্যক্তির উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ থাকা দরকার বলে তিনি মনে করেন। সমকালীন বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাসেল দেখিয়েছেন যে বৈজ্ঞানিক সমাজে ব্যক্তিকে তিন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়: সাধারণ মানুষ হিসেবে, বীর হিসেবে কিংবা যন্ত্রের দাস হিসেবে। বৈজ্ঞানিক সমাজ মানুষকে যন্ত্রের দাস হিসেবেই বেশি পছন্দ করে, এবং এটিই ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করছে। রাসেল বলেন, বিজ্ঞানকে সত্যিকার অর্থ মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চাইলে যন্ত্রের দাস নয়, বরং মানুষকে দেবতার আসনেই বসাতে হবে।
বিজ্ঞানের সাথে যুদ্ধের সম্পর্কও বিশ্লেষণ করেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি দেখিয়েছেন আর্কিমিদিস থেকে শুরু করে বিজ্ঞান কীভাবে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিজ্ঞানের দর্শনের চেয়ে বিজ্ঞানের কৌশলের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে এটি আরো বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। রাসেলের মতে, বিজ্ঞানের কৌশলের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার প্রধান কারণ হলো প্রয়োগবাদের প্রসার, যেখানে জ্ঞানের পরিবর্তে প্রায়োগিক দিককেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রয়োগবাদ এবং আরো কিছু মতবাদ, বিশেষ করে কার্ল মার্ক্সের ‘পৃথিবীকে বদলানো’র মতবাদ, মানুষের মূল্যবোধকে বদলে দিয়েছে, যা পক্ষান্তরে মানুষকে যুদ্ধংদেহী হতে উৎসাহিত করেছে।
বিভিন্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাসেল দেখিয়েছেন বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের সুখ প্রভূত পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি এটি ভেবেও চিন্তিত হয়েছেন যে, বর্তমানের চেয়ে আরো বেশি সুখ আশা করা যেত, যদি মানুষ যুদ্ধের জন্য এত বেশি শক্তি ব্যয় না করত। তিনি দেখিয়েছেন যে, বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের শ্রমের উৎপাদনশীলতা অনেক বেড়েছে, যার মাধ্যমে সম্পদের আরো বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব। কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না, সেই সম্পদের সুষম বণ্টনও দরকার বলে তিনি মনে করেন। বিজ্ঞান মানুষের জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা আগের দিনে ছিল না। এসব সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদেরকে আরো সচেতনভাবে বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নির্ধারণ করতে হবে আমরা সত্যিই বাঁচতে চাই, নাকি পরষ্পরের সাথে যুদ্ধ করে পুরো মানবজাতির ধ্বংস চাই।
এ পুস্তকের শেষ অধ্যায়ে রাসেল একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: বৈজ্ঞানিক সমাজ কি স্থিতিশীল হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরও খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে বাহ্যিক, জীবতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এসব বিশ্লেষণের পর তিনি কয়েকটি উপসংহার টেনেছেন যা আজকের দিনেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পাঠক হয়ত এসব পাঠ করতে গিয়ে দেখতে পাবেন যে তাঁর এসব উপসংহারের পথ ধরে অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে আজকের বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ, ভূমি ও পরিবেশের ক্ষয় রোধ, ইত্যাদির প্রতি অনেক মনোযোগী হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে বিশ্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কাও আজ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে এখনও যা বাকি আছে তাহলো সম্পদের সমবন্টন, সমৃদ্ধিকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া এবং বেশি করে ব্যক্তি উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি করা। রাসেলের ভাষায়: ‘এসব করা সম্ভব হলেই আমরা এমন এক বিশ্বে পৌঁছাব যেখানে যুদ্ধ ও দারিদ্র জয় করা সম্ভব হবে, এবং ভয়, কোথাও থাকলে, অযৌক্তিক হয়ে পড়বে।’
আমি বিশ্বাস করি বার্ট্রান্ড রাসেলের রচনা অনুবাদ করার জন্য আমার চেয়ে অনেক যোগ্য লোক বাংলাদেশে আছেন। দর্শনের কোনো অধ্যাপক কিংবা কোনো গুণীজন এটি অনুবাদ করলে পাঠক হয়ত অনেক বেশি খুশি হতো। কিন্তু যেহেতু সেটি ঘটছে না তাই স্বতপ্রণোদিত হয়ে এই অধমকেই এ ধরনের কাজে হাত দিতে হয়েছে।